সারাদেশ

মাদক মামলার সাক্ষী হওয়ায় মাতাল বানিয়ে হত্যাচেষ্টা, ঘরছাড়া বাবা-ছেলে

১৯ এপ্রিল ২০২১,বিন্দুবাংলা টিভি. কম,

রাজশাহী প্রতিনিধি:
রাজশাহীর গোদাগাড়ী থানার মাদারপুর গ্রামের চরাঞ্চল এলাকা থেকে ২ কেজি হেরোইন ও ১,৯৭৮ পিচ ইয়াবাসহ মো. আশরাফুল ইসলাম নামের এক মাদক ব্যবসায়ীকে গত ১৫ মার্চ রাত ১ টার দিকে গ্রেফতার করে বিজিবির টহলরত একটি দল। ওই সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকায় সাক্ষী হতে হয় মো. নাইমুল হক সেন্টু ও মো. সাদিকুল ইসলামকে। আটককৃত প্রায় অর্ধকোটি টাকার মূল্যের মাদক মামলার সাক্ষী হওয়াটায় কাল হয়ে দাঁড়ায় মো. নাইমুল হক সেন্টুর। এখন গৃহহীন দিন যাপন করছেন সাক্ষী সেন্টু ও তার ছেলে জুয়েলের।

গত ২ এপ্রিল অর্ধকোটি টাকার মাদক মামলার সাক্ষী সেন্টুকে হত্যার উদ্দেশ্যে নিজ বাড়ির সামনে মুখের মধ্যে দুটি পাইপ ঢুকিয়ে জোরপূর্বক মদ পান করিয়ে হত্যার চেষ্টা করা হয়। সেই সাথে ১২-১৫ জন মিলে লোহার পাইপ দিয়ে পুরো শরীরকে পিটিয়ে রক্তাক্ত করে দেওয়া হয় মাদক সম্রাট বাবু মেম্বারের নির্দেশে। উদ্দেশ্যে ছিল মাতাল সাব্যস্ত করে হত্যা করার। কিন্তু মাদক মামলার সাক্ষী সেন্টুর চিৎকার চেঁচামেচিতে এলাকাবাসী এগিয়ে আসলে পালাতে বাধ্য হয় মাদক সম্রাটের গুন্ডাবাহিনীরা।

প্রতিবেশীর ফোন পেয়ে ছুটে আসেন সন্তান জুয়েল। রক্তাক্ত অবস্থায় ঘটনাস্থল থেকে বাবাকে উদ্ধার করে নিয়ে আসেন রামেক হাসপাতালে। রামেক থেকে চিকিৎসা নিয়ে আশ্রয় নেন নিকটাত্মীয়ের বাসায়। এখন পর্যন্ত আশ্রিত রয়েছেন বাবা ও ছেলে।

সাক্ষী সেন্টুর ছেলে জুয়েলের দাবি, ‘এলাকায় ফিরলেই লাশ হয়ে যেতে হবে কবরে। রাষ্ট্রীয় সাক্ষী হওয়ার পরও আমার বাবার কোনো সুরক্ষা পায়নি। উল্টো তাকে প্রতিনিয়তই ভয়ভীতি দেওয়া হচ্ছে মোবাইলে। এমনকি কোর্টে সত্য না বলার জন্য বাবু মেম্বার মোটা অঙ্কের টাকারও প্রলোভন দিচ্ছেন। বাবা যেনো সাক্ষী না দেয় সেজন্য বারবার চাপ দিচ্ছেন তারা। তাদের ভয়ভীতি ও আর্থিক প্রলোভনের সমস্ত সাক্ষ্য প্রমাণও রয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘আমার বাসায় বৃদ্ধা মাসহ দুইজন প্রতিবন্ধী ভাই-বোন। বাবা-ছেলে বাড়িতে না থাকায় তারা মানবেতর জীবন যাপন করছেন। বাড়িতে ফিরতে না পারায় তাদের জীবনেও নেমে এসেছে চরম দূভোর্গ। অসহায় বৃদ্ধ মাকেও প্রায় বাবু মেম্বারের লোকেরা যেয়ে হুমকি ধামকি দিয়ে আসেন। সবমিলিয়ে চরম নিরাপত্তাহীনতায় কাটছে আমাদের দিন।’

এদিকে মাদক মামলার প্রধান সাক্ষী নাইমুল হক সেন্টু বলেন, ‘গোদাগাড়ী অঞ্চলে শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী ও সন্ত্রাসী হচ্ছেন সেতাবুর রহমান বাবু। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকাতেও রয়েছে তার নাম। ২কেজি হেরোইন ও প্রায় ২হাজার পিচ ইয়াবা ওই ব্যবসায়ী তারই লোক। তার বিরুদ্ধে কথা বলায় আজ আমার এই হাল।’

পুলিশের বিরুদ্ধে সাক্ষী সেন্টুর অভিযোগ, মাঠে কাজ করে বাড়ি ফেরার পথে সেতাবুর রহমান সেতা ৩৯, আরিফুল ইসলাম (৪০), সেলিম (৩২), মোতালেব (৩৪), সাইদুর (২৬), পিএস (২২), উজ্জ্বলসহ (২৩) আরোও ৭-৮জন মিলে আমাকে মারধর করে। এতে হাতের দুই আঙ্গুল ভেঙ্গে যায়। ‘পুলিশ প্রশাসন সবই তার পকেটে। যার জন্য মেলেনি ন্যায়বিচার।’

তিনি বলেন, ‘এসময় দুই পাইপ দিয়ে জোরপূর্বক আমার মুখের মধ্যে মদ ঢোকায় তারা। তাদের লোহার পাইপের আঘাতে আমার সামনের একটি দাতও ভেঙ্গে যায়। এলাকাবাসী রক্তাক্ত অবস্থায় উদ্ধার করে। পরে পুলিশকে জানানো হয়, কিন্তু পুলিশ কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।’

এবিষয়ে জুয়েল জানায়, বাবাকে রক্তাক্ত অবস্থায় দেখে সঙ্গে সঙ্গে এসআই হাবিবকে জানালে তিনি ওসির নাম্বার দেন। পরবর্তীতে ওসিকে ঘটনাটি জানালে তিনি বলেন- ‘মামলার বিষয় পরে দেখা যাবে, আগে নিজে বাচো।’ পরে বেশ কয়েকবার তার মোবাইলে ফোন দেওয়া হয়। কিন্তু তাতে মেলেনি সাড়া। তাদের অসহযোগিতার কারণে আর যোগাযোগ করিনি।

ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বিজিবির নায়েক সুবেদার মো. আনোয়ার হোসেনের ভাষ্য, ‘বিজিবির সাক্ষ্য হওয়ার জন্য সেন্টুকে হামলার স্বীকার হতে হয়েছে এটি সত্য নয়। তার হয়ত ব্যক্তিগত সমস্যা থাকতে পারে সেকারণেই এমন ঘটনা ঘটেছে। এতে মাদক মামলার সাক্ষী হওয়াটা বড় বিষয় নয়।’

তবে তিনি স্বীকার করেন, গত ২ এপ্রিল তাকে ১০-১৫ জন মিলে মারধর করে এবং সেই খবর পেয়ে তাকে উদ্ধারের জন্য ঘটনাস্থলে গিয়ে দূবৃত্তদের হাত থেকে উদ্ধার করা হয়। তবে বিজিবি চলে আসার পর তাকে আবার মারধর করেন সেটিও তিনি স্বীকার করেছেন।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে ৮নং মাটিকাটা ইউনিয়নের মেম্বার সেতাবুর রহমান বাবু বলেন, ‘এসব কথা অসত্য ও ভিত্তিহীন। আমি জনপ্রতিনিধি হয়ে কাউকে মারার নির্দেশ দেয়নি। বরং সেখানে গন্ডগোল হওয়ার আভাস পাওয়ায় সেন্টুর ভ্যাস্তেকে সতর্ক করে দেয়, সেন্টু যেনো কোন বিষয়ে কারো সাথে তর্থ-বিতর্কে না জড়ায় অন্যথায় ঝামেলা হতে পারে।

তবে তিনি মোবাইলে সেন্টুর ছেলে জুয়েলকে রাগান্বিত হয়ে উচ্চস্বরে ঔদ্ধত্ত্বেও সাথে কথা বলার বিষয়টি স্বীকার করেন। এছাড়াও কোনো প্রকার মামলা মোকাদ্দমায় না জড়িয়ে আপোষ মীমাংসার জন্য সমঝোতা করার প্রস্তাবও দেন।

এবিষয়ে গোদাগাড়ী থানার ওসি মো. খলিলুর রহমান পাটোয়ারী বলেন, ‘ওই ঘটনায় তারা কোন মামলা বা অভিযোগ দায়ের করেননি। মামলা দায়ের হলে অবশ্যই আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

Related Articles

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Back to top button