অর্থনীতি

অনেক ব্যাংকে টাকা নেই

৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯,বিন্দুবাংলা টিভি. কম,

ডেস্ক রিপোর্ট : নজিরবিহীন তারল্য সংকটে ভুগছে দেশের ব্যাংক খাত। কোনো কোনো ব্যাংকের প্রয়োজন মেটানোর মতো অর্থও নেই। তবে ঋণ বিতরণে পিছিয়ে থাকায় সরকারি ব্যাংকগুলোয় কিছু নগদ অর্থ রয়েছে। কিন্তু সামগ্রিকভাবে ব্যাংকিং খাতে নগদ অর্থ রেকর্ড পরিমাণ কমে গেছে। মূলত আগ্রাসীভাবে ঋণ বিতরণ, ডলার সংকট, আমানত সংগ্রহ করতে না পারা এবং খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির কারণে এ সংকট তৈরি হয়েছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। দৈনিক আমাদরে সময়

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, চলতি বছরে মে মাসে ব্যাংকগুলোর মোট তরল সম্পদ দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৪৬ হাজার ৭৯৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে নগদ জমা সংরক্ষণ (সিআরআর) এবং বিধিবদ্ধ জমা (এসএলআর) হিসেবে ১ লাখ ৮৬ হাজার ২৪৬ কোটি টাকা জমা রাখতে বাধ্য ব্যাংকগুলো। প্রয়োজনের বাইরে ব্যাংকগুলোর নগদ অর্থ আছে মাত্র ৬০ হাজার ৫৪৯ কোটি টাকা।

এটি গত সাড়ে ৬ বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম। এর আগে ২০১৩ সালের জানুয়ারিতে ব্যাংকগুলোর অতিরিক্ত তারল্য ছিল ৫৯ হাজার ৯৫৪ কোটি টাকা। এর পর ২০১৮ সালের আগ পর্যন্ত নগদ টাকার এ তহবিল কখনই লাখ টাকার নিচে নামেনি। গত ছয় বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ ১ লাখ ৪০ হাজার ২৪৩ কোটি টাকা অতিরিক্ত তারল্য ছিল ২০১৪ সালের মে মাসে। তার পরের বছরের একই মাসে এটি কমে ১ লাখ ৪ হাজার ৭১৪ কোটি টাকায় নেমে আসে। ২০১৬ সালের মে মাসে অতিরিক্ত তারল্য বেড়ে হয় ১ লাখ ১৩ হাজার ৫৬৬ কোটি টাকা।

২০১৭ সালের মে মাসে আবার কমে হয় ১ লাখ ৩ হাজার ২০৪ কোটি টাকা। ব্যাংকগুলো আগ্রাসীভাবে ঋণ বিতরণ শুরু করে ২০১৭ সালের পর থেকেই। নিয়মনীতি লঙ্ঘন করে ঋণ বিতরণের অসুস্থ প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয় ব্যাংকগুলো। দেশের ভেতরে ছাড়াও দেশের বাইরে থেকে পণ্য আমদানিতে ব্যাংকগুলোর অর্থায়ন ব্যাপকহারে বাড়ে। ফলে ২০১৮ সালের মে মাসে অতিরিক্ত তারল্য ৭৯ হাজার ৬৫০ কোটি টাকায় নেমে আসে। এর পর ব্যাংকিং খাতে শুরু হয় নয়ছয় সুদ নৈরাজ্য। আমানতের বিপরীতে সুদহার ব্যাপকহারে কমিয়ে দেয় ব্যাংকগুলো। সাধারণ মানুষ বিকল্প খাত সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ বেশি করতে থাকে। এতে ব্যাংকগুলোর বিপদ আরও বাড়ে। ফলে চলতি বছরের রেকর্ড পরিমাণ কমে গেছে ব্যাংকগুলোর নগদ টাকা।

জানতে চাইলে বাংকগুলোর প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান ও ঢাকা ব্যাংকের এমডি সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, নতুন আমানত আসছে কম। অনেকে মেয়াদ পূর্তির পর আমানত ভাঙিয়ে ফেলছে। অথচ ঋণ দেওয়ার চাপ রয়েছে। আবার আগের দেওয়া ঋণের মধ্য থেকে খেলাপি হওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। আবার আমদানির চাহিদা থাকায় ব্যাংকগুলোর টাকার বিনিময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছ থেকে ডলার কিনেছে। ফলে ব্যাংকের কাছে অর্থ আসা কমে গেছে। ফলে এ সংকট তৈরি হয়েছে।

গত বছরের জুলাই থেকে আমানতে সর্বোচ্চ ৬ এবং ঋণে সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ সুদ কার্যকরের ঘোষণা দেন ব্যাংকের চেয়ারম্যানরা। এতে আমানতের সুদহার কমে গেলেও ঋণের সুদহার কমেনি। তবে ব্যাংকের তুলনায় সঞ্চয়পত্রের সুদহার বেশি ছিল। ফলে গ্রাহকরা ব্যাংক থেকে টাকা তুলে সঞ্চয়পত্র কিনেছেন। গত অর্থবছরে সর্বমোট ৯০ হাজার কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে। এ টাকা ব্যাংকে আমানত রাখা হলেও ব্যাংকগুলো অর্থ সংকট কিছুটা হলেও কমত।

অন্যদিকে গত বছরে পণ্য আমদানির চাপ বেশি ছিল। কিন্তু সেই তুলনায় রপ্তানি আয় বাড়েনি। তাই আমদানি ব্যয়ের চাপ সামলাতে প্রয়োজনীয় ডলার আয় করতে পারেনি ব্যাংকগুলো। ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছ থেকে ২৩৩ কোটি ৯০ লাখ ডলার কেনা হয়েছে। এ ডলার কিনতে ব্যাংকগুলোর ব্যয় হয়েছে ২০ হাজার কোটি টাকা।

অন্যদিকে ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রতিনিয়ত বাড়ছে। অর্থাৎ ব্যাংক যে টাকা বিতরণ করছে তা গ্রাহকের পকেটে আটকে যাচ্ছে। সেই টাকা ব্যাংকের কাছে ফেরত আসছে না। এক বছরে খেলাপি ঋণ ২৩ হাজার কোটি টাকা বেড়ে হয়েছে ১ লাখ ১২ হাজার ৪২৫ কোটি টাকা।

একদিকে আমানত কমে যাওয়া, অন্যদিকে ঋণের টাকা আদায় করতে না পারায় ব্যাংকগুলোর নগদ টাকা সংগ্রহ কমে গেছে। ফলে ঋণ বিতরণ সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে ঋণ বিতরণ বেড়েছে ১১ দশমিক ২৬ শতাংশ, যা গত ছয় বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।

কোনো কোনো ব্যাংকের কাছে ঋণ বিতরণের মতো অর্থ তো দূরের কথা প্রয়োজন মেটানোর মতো অর্থ নেই। বাধ্য হয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছ থেকে ধার নিচ্ছে কয়েকটি ব্যাংক। সর্বশেষ গত ২৬ আগস্টও রেপোর মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছ থেকে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা ধার নিয়েছে কয়েকটি ব্যাংক। এর বাইরে অন্য ব্যাংকের কাছ কলমানিতে প্রতিদিন ৩ থেকে ৪ হাজার কোটি টাকা ধার নিচ্ছে ব্যাংকগুলো।

Related Articles

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Back to top button